আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, দশম শ্রেণির ভূগোলের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করব অত্যন্ত মজাদার এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে, যার নাম ‘বহির্জাত প্রক্রিয়া এবং পর্যায়ন‘। তোমরা যখন বাড়ির বাইরে বের হও বা কোথাও ঘুরতে যাও, তখন কি চারপাশের মাটি, নদী, পাহাড় বা দিগন্তবিস্তৃত সমতলভূমির দিকে ভালো করে লক্ষ করো? এই যে আমাদের চারপাশের এত বৈচিত্র্যময় পরিবেশ—কোথাও আকাশছোঁয়া উঁচু পাহাড়, কোথাও গভীর খাদ, আবার কোথাও বা সমতল মাঠ—এগুলোকে ভূগোলের পরিভাষায় বলা হয় ‘ভূমিরূপ’। পর্বত, মালভূমি এবং সমভূমি হলো আমাদের এই পৃথিবীর ভূমির একেবারে প্রাথমিক রূপ।
বহির্জাত প্রক্রিয়া কি?
কিন্তু খুব মজার একটি ব্যাপার হলো, আজ আমরা যে পাহাড়, নদী বা মালভূমিকে ঠিক যেমন দেখছি, হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ বছর আগে তারা কিন্তু ঠিক এমন ছিল না। আর ভবিষ্যতেও এমন থাকবে না। কেন জানো? কারণ প্রকৃতির কিছু অসীম শক্তি দিনরাত, নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে এদের রূপ পালটানোর জন্য। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠের বাইরের শক্তিগুলো—যেমন নদীর জলস্রোত, বয়ে চলা বাতাস, বিশাল বরফের স্তূপ বা হিমবাহ এবং সমুদ্রের ঢেউ—দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে ভূমিরূপের পরিবর্তন ও বিবর্তন ঘটায়, তাকেই বলা হয় বহির্জাত প্রক্রিয়া (Exogenetic Processes)।
বহির্জাত প্রক্রিয়া কিভাবে ভুমিরুপ পরিবর্তন করে?
তোমরা হয়তো ভাবছ, এই বাইরের শক্তিগুলো ঠিক কোথা থেকে কাজ করার শক্তি পায়? এদের মূল শক্তির উৎস হলো দুটি—আমাদের সৌরশক্তি বা সূর্যের তাপ এবং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। সূর্যের তাপে যেমন নদী বা সমুদ্রের জল বাষ্প হয়ে বৃষ্টি রূপে ঝরে পড়ে নদীর জলপ্রবাহকে সচল রাখে, ঠিক তেমনি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অমোঘ টানে নদীর জল বা ভারী হিমবাহ পাহাড়ের উঁচু ঢাল থেকে ক্রমশ নীচের দিকে নেমে আসে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করে আমাদের পৃথিবীর রূপ পালটায়? মূলত দুটি প্রধান পদ্ধতির মাধ্যমে এরা কাজ করে—একটি হলো ‘অবরোহণ’ এবং অপরটি হলো ‘আরোহণ’ বা সঞ্চয়।
ধরো, তোমার বাড়ির কাছে একটি বিশাল উঁচু মাটির ঢিবি বা পাহাড় আছে। প্রবল বৃষ্টির জলে, নদীর স্রোতের ধাক্কায় বা হিমবাহের ঘর্ষণে সেই পাহাড়ের পাথর একটু একটু করে ক্ষয়ে গিয়ে পাহাড়টি ধীরে ধীরে নীচু হয়ে গেল। ভূগোলের ভাষায়, প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের উঁচু স্থান ক্ষয় পেয়ে এই নীচু হয়ে যাওয়াকেই বলা হয় অবরোহণ (Degradation)। অর্থাৎ, অবরোহণ হলো ক্ষয়কারী প্রক্রিয়া।
অন্যদিকে, ক্ষয় হয়ে যাওয়া ওই মাটি, বালি বা পাথরের টুকরোগুলো তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না! নদীর জল বা প্রবল বাতাস সেগুলো বয়ে নিয়ে গিয়ে কোনো নীচু গর্ত, হ্রদ বা উপত্যকায় জমিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে পলি বা বালি জমতে জমতে সেই নীচু জায়গাটা ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে যায়। এই নীচু জায়গা ভরাট হয়ে উঁচু হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় আরোহণ (Aggradation)। অর্থাৎ, এটি হলো একটি সঞ্চয়কারী প্রক্রিয়া।
এই অবরোহণ (উঁচু জায়গা ক্ষয়ে নীচু হওয়া) এবং আরোহণ (নীচু জায়গা ভরাট হয়ে উঁচু হওয়া)—এই দুটি প্রক্রিয়ার মিলিত ফলে যখন পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট জায়গার উচ্চতা প্রায় সমান বা সমতল হয়ে যায়, তখন সেই সামঞ্জস্যপূর্ণ সমতল অবস্থাকে বলা হয় পর্যায়ন (Gradation)। বিখ্যাত দুই ভূবিজ্ঞানী চেম্বারলিন এবং সলিসবরি সর্বপ্রথম এই ‘পর্যায়ন’ শব্দটি ভূগোলে ব্যবহার করেছিলেন। তাই বহির্জাত প্রক্রিয়াকে অনেক সময় পর্যায়ন প্রক্রিয়াও বলা হয়। মনে রাখবে, যেকোনো প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষয়কাজের একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। নদী চাইলেই পাতালে প্রবেশ করতে পারে না। সাধারণত সমুদ্রের জলের স্তর বা সমুদ্রতলকেই নদীক্ষয়ের শেষ সীমা বলা হয়।
বহির্জাত প্রক্রিয়া, অবরোহণ ও আরোহণ ক্যুইজ ও তথ্যমালা
আশা করি বিষয়টি তোমরা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছ। চলো, এবার নিচের স্লাইডগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো আরও একবার ঝালিয়ে নিই এবং তারপর কুইজে অংশ নিয়ে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাই করি!
Total Slides: 7
Total Questions: 23 | Total Marks: 35
